Tag Archives: বুকবিল্ডিং

বুকবিল্ডিং পদ্ধতির সংস্কার নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি

প্রাথমিক শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বুকবিল্ডিং পদ্ধতির সংস্কার বিষয়ে সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) প্রস্তাবের ওপর মতামত দেয়ার জন্য এক সপ্তাহ সময় নিয়েছে পুঁজিবাজার সংশিস্নষ্ট চারটি প্রতিষ্ঠান। সংশিস্নষ্ট বিধিমালার সংশোধনী চূড়ান্ত করতে সোমবার এসইসিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই সময় দেয়া হয়। দুই স্টক এঙ্চেঞ্জ, বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিপিএলসি) এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স এ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) নেতারা তাৎৰণিকভাবে কোন মতামত প্রদানে অসম্মত হওয়ায় চূড়ানত্ম সিদ্ধানত্ম গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
এসইসি চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিশনের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা চৌধুরী বুকবিল্ডিং পদ্ধতি সংস্কারের জন্য পাবলিক ইসু্য বিধিমালা, ২০০৬-এর প্রসত্মাবিত সংশোধনী সম্পর্কে কমিশনের প্রসত্মাব তুলে ধরেন। এতে কোন কোম্পানির প্রাথমিক শেয়ারের নির্দেশক মূল্য ও আয়ের (পি/ই) অনুপাত ১৫ এর কম এবং শেয়ারপ্রতি এনএভির পাঁচ গুণের নিচে রাখার প্রসত্মাব করা হয়। এসইসির প্রসত্মাবে নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের সর্বোচ্চ সীমার পাশাপাশি নূ্যনতম মূল্য নিশ্চিত করার উপরও গুরম্নত্ব দেয়া হয়েছে। কোন প্রতিষ্ঠান সংশিস্নষ্ট কোম্পানির এনএভির কম নির্দেশক মূল্য প্রসত্মাব করতে পারবে না। আর মূল্য নির্ধারণে কোম্পানির তিন বছরের আয়ের গড়ের ভিত্তিতে পিই নির্ধারিত হবে। নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের লৰ্যে রোড শো’ আয়োজনের কমপৰে ৫ দিন আগে কোম্পানির বিবরণীর (প্রসপেক্টাস) খসড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের কাছে পাঠাতে হবে। তবে এতে কোনভাবেই নির্দেশক মূল্যের কোন প্রসত্মাব করা যাবে না। কোম্পানির আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনার জন্য আইসিএবি, আইসিএমএবি, দুই স্টক এঙ্চেঞ্জের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। তবে এতে কোম্পানির সঙ্গে সংশিস্নষ্ট কোন ব্যক্তি থাকতে পারবেন না।
কমিশনের প্রসত্মাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দর প্রসত্মাব (বিডিং) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বরাদ্দ শেয়ার বিক্রির নিষেধাজ্ঞা ১৫ দিন থেকে বাড়িয়ে ৬০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। দর প্রসত্মাব প্রক্রিয়ার সময়সীমা তিন দিনের পরিবর্তে দু’দিন করার কথা বলা হয়েছে। দর প্রসত্মাবের মাধ্যমে চূড়ানত্ম মূল্য নির্ধারণের দু’দিনের মধ্যে আইপিও বিবরণী (প্রসপেক্টাস) এসইসিতে জমা এবং ১৫ দিনের মধ্যে আবেদন গ্রহণ শুরম্নর বাধ্যবাধকতা আরোপ করার কথা বলা হয়।
এসইসির প্রসত্মাবের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বিএপিএলসির চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে জটিলতা এড়াতে বুকবিল্ডিং পদ্ধতি বাতিলের প্রসত্মাব করেন। তিনি নির্ধারিত মূল্য (ফিঙ্ড প্রাইস) পদ্ধতির মাধ্যমে পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রসত্মাব করেন। তবে ডিএসই-সিএসই, বিএমবিএ প্রতিনিধি এবং এসইসি কর্মকর্তারা তার এই প্রসত্মাবের বিরোধিতা করেন। তাঁরা বলেন, দীর্ঘদিন পরীৰা-নিরীৰার পর বুকবিল্ডিং পদ্ধতি প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন পদ্ধতি হিসেবে এর কিছু অপব্যবহার হয়েছে। কিন্তু মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা কোন সমাধান হতে পারে না। দুর্বলতাগুলো দূর করে বুকবিল্ডিং পদ্ধতি কার্যকর করতে হবে।
পরে দুই স্টক এঙ্চেঞ্জ, বিএপিএলসি এবং বিএমবিএ প্রতিনিধিরা তাৎৰণিকভাবে এসইসির প্রসত্মাবের ওপর কোন মতামত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তাঁরা জানান, বৈঠকের আগে এসইসির প্রসত্মাবগুলোর লিখিত আকারে না পাওয়ায় তাদের পৰে মতামত দেয়া সম্ভব নয়। তারা সংশিস্নষ্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে পরবর্তীতে এসইসির প্রসত্মাবের ওপর মতামত পেশ করার কথা বলেন। এসইসি কর্মকর্তারা এতে সম্মত হলে পরবর্তীতে আরেকটি বৈঠক করে সব প্রতিষ্ঠানের মতামত গ্রহণের সিদ্ধানত্ম নেয়া হয়।
বৈঠক শেষে এসইসির মুখপাত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, দুই স্টক এঙ্চেঞ্জ, বিএপিএলসি এবং বিএমবিএ নেতারা বুকবিল্ডিং পদ্ধতি সংশোধনের বিষয়ে এসইসির প্রসত্মাবগুলো নিয়ে গেছেন। নিজ নিজ ফোরামে আলোচনার পর তাঁরা কমিশনের কাছে মতামত পেশ করবে। এর ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনে আরও আলাপ-আলোচনার পর সংশোধনী চূড়ানত্ম করা হবে।
বিএপিএলসির চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান বলেন, এসইসির প্রসত্মাবের আগামী ২৮ মার্চ আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। নিজস্ব ফোরামে আলোচনার পর প্রতিটি সংগঠন ওই দিনের বৈঠকে তাদের মতামত পেশ করবে। ওইদিনই বুকবিল্ডিং পদ্ধতির সংশোধনী চূড়ানত্ম হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, মূলত প্রাথমিক শেয়ারের একটি গ্রহণযোগ্য মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ঠিক করার বিষয়টিই গুরম্নত্ব দেয়া হচ্ছে। তবে বাজারে আসার পর শেয়ারের দর অস্বাভাবিক হারে কমে গেলে কী ধরনের পদৰেপ নেয়া হবে তাও ভাবতে হবে।
ডিএসইর সিনিয়র সহ-সভাপতি আহসানুল ইসলাম টিটু বলেন, শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বর্তমানে বুকবিল্ডিং পদ্ধতির কাযর্কারিতা স্থগিত রয়েছে। এটিকে পুনরায় কার্যকর করাই মূল লৰ্য।
তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ বছর আলাপ-আলোচনার পর বুকবিল্ডিং পদ্ধতি প্রণয়ন করা হয়েছে। পুঁজিবাজারের জন্য এটি অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এই পদ্ধতির কয়েকটি ধারার অপব্যবহার করে কেউ কেউ বাজার থেকে বাড়তি সুবিধা আদায় করেছে। এই প্রবণতা বন্ধ করতে সংশিস্নষ্ট ধারাগুলো কীভাবে সংশোধন করা যায়_ সে বিষয়েই আলোচনা হচ্ছে।
এসইসি সদস্য মো. ইয়াসিন আলী ও মো. আনিসুজ্জামান, নির্বাহি পরিচালক ফরহাদ আহমেদ, এটিএম তারিকুজ্জামান, সাইফুর রহমান, ডিএসইর সিইও সতিপতি মৈত্র, সিএসইর সিনিয়র সহ-সভাপতি আল মারম্নফ খান, সিইও অধ্যাপক ড. আবদুলস্নাহ মামুন, বিএমবিএ সভাপতি শেখ মোতর্জা আহমেদ প্রমুখ বৈঠকে উপস্থি ছিলেন।

Source: The daily janakantha, 22 March, 2011

বুকবিল্ডিং পদ্ধতি স্থগিত নয়, প্রয়োজন কার্যকর সংস্কার

টানা বিপর্যয়ের পর দেশের পুঁজিবাজারে আবারও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহের শেষ লেনদেনে বাজারের স্বাভাবিক আচরণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। তবে উলেস্নখযোগ্য হারে দরপতনের পরও অনেক কোম্পানির শেয়ারের দর অতি মূল্যায়িত হয়ে আছে। ফলে একটানা দরবৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে শেয়ারবাজার আবারও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিমুক্ত রাখতে ভাল শেয়ারের যোগান বাড়ানো জরুরী। বিপর্যয়ের ফলে বিনিয়োগকারীদের যে লোকসান হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতেও গ্রহণযোগ্য দরে নতুন শেয়ারের যোগান বাড়ানোকেই সবচেয়ে বড় উপায় বলে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন।
বিশেস্নষণে দেখা গেছে, গত প্রায় দেড় বছর ধরে যৌক্তিক সংশোধন ছাড়াই ধারাবাহিক উর্ধগতির কারণে দেশের পুঁজিবাজার ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মূলত নানা উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হলেও তার সঙ্গে পালস্না দিয়ে শেয়ারের যোগান বাড়াতে না পারার কারণেই অধিকাংশ শেয়ার অতি মূল্যায়িত হয়ে পড়ে। এরপরও নানা ধরনের গুজব ও প্রলোভনের কারণে শেয়ার ধরে রাখেন অধিকাংশ বিনিয়োগকারী। একের পর এক পদৰেপ নিয়েও বাজারের রাশ টানতে ব্যর্থ হয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি। ওই অবস্থায় শেয়ারবাজারে জমে ওঠা পুঁজি উৎপাদনমুখী খাতে স্থানান্তর করে শেয়ারের যোগান বাড়ানো সবচেয়ে জরম্নরী ছিল। কিন্তু কোম্পানির ৪০ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার বাধ্যবাধকতা এবং আমলতান্ত্রিক জটিলতার কারণে উলেস্নখযোগ্য সংখ্যক নতুন ইসু্য বাজারে আসতে পারেনি। এর বিপরীতে বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় তীব্র হয়ে ওঠে ভাল শেয়ারের সঙ্কট। চাহিদা ও যোগানের এই অসামঞ্জস্যতাই বাজারে বিপর্যয়ের পথ তৈরি করে।
পুঁজিবাজারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর পরিস্থিতি সামাল দিতে বুকবিল্ডিং পদ্ধতির কার্যকারিতা স্থগিত রাখার পাশাপাশি প্রক্রিয়াধীন প্রাথমিক গণপ্রসত্মাব (আইপিও) অনুমোদনে ধীরে চলার নীতি অবলম্বন করছে সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এর ফলে পুঁজিবাজারে আসার অপেৰায় থাকা উলেস্নখযোগ্যসংখ্যক কোম্পানির ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আর সামগ্রিকভাবে বাজারে শেয়ারের যোগান বাড়ানোর প্রচেষ্টায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নানামুখী প্রচেষ্টার সঙ্গে ভাল শেয়ারের যোগান বৃদ্ধির প্রক্রিয়াও অব্যাহত রাখতে হবে বলে বিশেস্নষকদের অভিমত।
পুঁজিবাজারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করতে গিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিকে দায়ী করা হচ্ছে। কারণ বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে এ পর্যনত্ম অনুমোদন পাওয়া সব কোম্পানিই লেনদেন শুরম্নর আগে থেকেই অতি মূল্যায়িত হয়েছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আগেই শেয়ারের অতি মূল্যায়ন রোধ এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজার থেকে অতিরিক্ত অর্থ স্থানানত্মরের সুযোগ বন্ধে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে বুক বিল্ডিং পদ্ধতির কার্যকারিতা স্থগিত করেছে সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এর ফলে ৪৮টি কোম্পানির শেয়ারবাজারে আসার প্রক্রিয়া থমকে গেছে।
জানা গেছে, নির্ধারিত মূল্য পদ্ধতিতে বাজারে আসার প্রক্রিয়ায় থাকা কোম্পানিগুলোর ৰেত্রেও ধীরে চলার নীতি অবলম্বন করছে এসইসি। টানা দরপতনের প্রেৰিতে সালভো কেমিক্যালের আইপিও আবেদন গ্রহণের সময় পিছিয়ে দেয়া হয়। এছাড়া সব কিছু চূড়ানত্ম হওয়ার পরও কয়েকটি কোম্পানির আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেয়া হয়েছে।
বিশেস্নষকরা মনে করেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকি কমাতে হলে শেয়ারের যোগান বাড়ানোই হবে সবচেয়ে বড় সমাধান। কারণ বাজারে শেয়ারের মূল্য ও আয়ের গড় অনুপাত এখনও ২০-এর বেশি। এছাড়া সূচক যে অবস্থানে রয়েছে তাতে কয়েকদিন টানা বৃদ্ধিতেই বিপর্যয়ের আগের অবস্থানে চলে যেতে পায়ে। এতে বাজারে আরেক দফা বড় দরপতনের ঝুঁকি বাড়বে। এ অবস্থায় সহনীয় ও গ্রহণযোগ্য মূল্যে নতুন শেয়ারের যোগান বাড়াতে পারলে বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বাজারের জন্যও তা ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
বাজার সংশিস্নষ্টরা মনে করেন, বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বাড়াতে হলে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে বুকবিল্ডিং পদ্ধতি পুনরায় কার্যকর করতে হবে। পেস্নসমেন্টের মাধ্যমে শেয়ার বরাদ্দের সুযোগ বন্ধ ও দর প্রসত্মাবে (বিডিং) বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের লক ইনের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হলে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে কারসাজির প্রবণতা অনেকটাই কমে যাবে। পাশাপাশি এসইসির হাতে শেয়ারের নির্দেশক মূল্য সংশোধনের সুযোগ রাখা হলে অতি মূল্যায়িত হয়ে বাজারে আসার পথ বন্ধ হবে।
তাদের মতে, বুকবিল্ডিং পদ্ধতি স্থগিত করে রাখলে প্রক্রিয়াধীন থাকা ৪৮টি কোম্পানির পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এতে পুঁজিবাজারে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার শেয়ার সরবরাহ বন্ধ হবে। এতে তীব্র শেয়ার সঙ্কট থেকে সৃষ্ট বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে সাময়িক উত্তরণ সম্ভব হলেও তা টেকসই করা যাবে না।

Source: The daily janakantha, 30 Jan, 2011

বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতেও শেয়ারের দর অতিমূল্যায়িত হচ্ছে

পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে বুকবিল্ডিং পদ্ধতি কার্যকর করেও শেয়ারের অতি মূল্যায়ন ঠেকানো যাচ্ছে না। সংশিস্নষ্ট বিধি-বিধানের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কারসাজির মাধ্যমে অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করে শেয়ারবাজার থেকে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের পথ তৈরি করছে কোম্পানিগুলো। কোন রকম প্রশ্ন ছাড়াই মৌলভিত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন দর অনুমোদন করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। বুকবিল্ডিং পদ্ধতি প্রয়োগের ৰেত্রে এ ধারা অব্যাহত থাকলে বড় কোম্পানির উদ্যোক্তারা অযৌক্তিকভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নেয়ার সুযোগ পাবে। অন্যদিকে অতি মূল্যায়িত শেয়ার সংখ্যা বেড়ে গেলে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হবে।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির জন্য শেয়ারের প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণের লৰ্যে বুকবিল্ডিং পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক আগে থেকেই সফলভাবে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। দেশের পুঁজিবাজারে এই পদ্ধতি চালু করার জন্য গত বছরের ৯ মার্চ বিধিমালা জারি করে এসইসি। প্রচলিত পদ্ধতির নির্ধারিত মূল্যের (ফিঙ্ড প্রাইস) পাশাপাশি বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারের দর নির্ধারণের লৰ্যে ২০০৬ সালের সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক ইস্যু) আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হয়। বুকবিল্ডিং পদ্ধতি চালুর হলেও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি না থাকায় এটি প্রয়োগ করতে সময় লেগেছে এক বছর। ২০১০ সালের মার্চে এই পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু হয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বুকবিল্ডিং পদ্ধতির মাধ্যমে একপক্ষ লাভবান হচ্ছে। একইসঙ্গে সিন্ডিকেট করে কোম্পানির মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। এই পদ্ধতির অংশ হিসেবে দর প্রস্তাবের (বিডিং) মাধ্যমে বরাদ্দ পাওয়া শেয়ার বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞার (লক ইন) মেয়াদ খুবই কম হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বেশি দরে শেয়ার বিক্রি করে বের হয়ে যায়। পরবর্তীতে ওই শেয়ারের দর কমে যায়। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বিশেস্নষকদের মতে, বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে এ পর্যন্ত অনুমোদন পাওয়া সব কোম্পানিই লেনদেন শুরুর আগে থেকেই অতি মূল্যায়িত হয়েছে। অতি মূল্যায়িত হিসেবে এসইসি বর্তমানে কোন শেয়ারের বাজার মূল্য ও আয়ের অনুপাত ৪০-এর বেশি হলে মার্জিন ঋণ দেয়া নিষিদ্ধ করে রেখেছে। অথচ বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে বাজারে আসা সব কোম্পানিই পিই অনুপাত ৪০-এর উপরে থেকে লেনদেন শুরম্ন করে। এই পদ্ধতি প্রথম মূল্য নির্ধারণ হয় ওশন কন্টেইনারের। ২০০৯ সালে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ২ টাকা ৪০ পয়সা। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কোম্পানির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারিত হয় ১৪৫ টাকা। ফলে লেনদেন শুরম্নর আগেই প্রতিটি শেয়ারের দর এর প্রকৃত আয়ের তুলনায় ৬০ গুণ বেশি নির্ধারিত হয়। আরএকে সিরামিকের ইপিএস ছিল ১ টাকা ৯ পয়সা। বুকবিল্ডিং পদ্ধতি প্রয়োগ করে কোম্পানিটির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৪৮ টাকা। শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরম্নর আগেই কোম্পানিটির পিই অনুপাত দাঁড়ায় ৪৪। খুলনা পাওয়ারের ইপিএস ছিল ২ টাকা ৭৯ পয়সা। এই কোম্পানির শেয়ারের মূল্য নির্ধারিত হয় ১৯৪ টাকা। ফলে লেনদেনের শুরম্নতেই খুলনা পাওয়ারের শেয়ারের পিই দাঁড়ায় ৬৯। বর্তমানে বাজারে আসার প্রক্রিয়ায় থাকা মবিল যমুনা লুব্রিক্যান্টের সর্বশেষ বার্ষিক হিসাবে ইপিএস ২ টাকা ৪৫ পয়সা। এই কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫২ টাকা ৪০ পয়সা। ফলে মবিল যমুনার পিই দাঁড়াচ্ছে ৬২। সর্বশেষ অনুমোদন পাওয়া ইউনিক হোটেলস এ্যান্ড রিসোর্টসের ইপিএস ৪ টাকা ৮০ পয়সা। এই কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের নির্দেশক মূল্য ধরা হয়েছে ১৮৫ টাকা। ফলে চূড়ানত্ম মূল্য নির্ধারণের আগেই ইউনিকের পিই দাঁড়াচ্ছে ৩৮.৫০।
সংশিস্নষ্ট বিধি-বিধান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নির্ধারিত মূল্য (ফিঙ্ড প্রাইস) পদ্ধতির ৰেত্রে কোন কোম্পানির শেয়ারের দর মৌলভিত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন হলে এসইসি তা কাটছাঁট করতে পারে। কিন্তু বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে সুনির্দিষ্টভাবে সেই সুযোগ নেই। আইনের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সংশিস্নষ্ট কোম্পানিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর কোন রকম প্রশ্ন ছাড়াই তা অনুমোদন করে দিচ্ছে এসইসি।
মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্র জানায়, বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের ৰেত্রেই কোম্পানিগুলো কারসাজির সুযোগ নিচ্ছে। বিধি অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দর প্রসত্মাব প্রক্রিয়ার আগে কোম্পানির শেয়ারের নির্দেশক মূল্য নির্ধারণ করতে হয়। নিজেদের পছন্দ মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে অতিরিক্ত নির্দেশক মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য থাকছে প্রাতিষ্ঠানিক দরপ্রসত্মাবে শেয়ার পাওয়ার নিশ্চয়তা। পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দর প্রসত্মাবের ভিত্তিতে নির্দেশক মূল্যের ২০ শতাংশ কম বা বেশি দরে চূড়ানত্ম মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এৰেত্রেও সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখে পূর্ব নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানগুলো। এজন্য পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে আইপিওর বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে আরও সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন পুঁঁজিবাজার সংশিস্নষ্টরা। তারা নির্দেশক মূল্য নির্ধারণে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা ও পেশাগত সক্ষমতা যাচাইয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্পষ্ট নির্দেশনা কামনা করেন।
জানা গেছে, মূল্য নির্ধারণে সমঝোতা ও কারসাজির বিষয়টি স্পষ্ট হলেও এ নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলছে না এসইসি। অথচ বুকবিল্ডিং পদ্ধতির সংশিস্নষ্ট বিধিতেই এসইসিকে এই সুযোগ দেয়া হয়েছে। এসইসি (ক্যাপিটাল ইসু্য) আইন, ২০০৬ এর ১৯এ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই বিধি নিয়ে কোন ধরনের সন্দেহ বা মতভিন্নতা তৈরি হলে এসইসির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।’ অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ হলে করণীয় সম্পর্কে আইনে স্পষ্ট কিছু উলেস্নখ না থাকায় ১৯এ ধারা কাজে লাগিয়ে এসইসি প্রয়োজনীয় পদৰেপ নিতে পারে।

Source: The daily janakantha, 10 January, 2011