উচ্চ প্রিমিয়ামে আইপিওর শেয়ারে লোকসান
পুঁজিবাজারের সেকেন্ডারি মার্কেটে চলমান মন্দার প্রভাব পড়েছে প্রাইমারি মার্কেটেও। সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেন হওয়া কয়েকটি কম্পানির শেয়ারের দর গত কয়েক দিনে প্রাথমিক বাজারের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) জন্য ধার্য করা মূল্যেরও নিচে বা কাছাকাছি চলে আসায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম ধার্য করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে বাজার সংশ্লিষ্টদের অভিমত। এ জন্য প্রিমিয়াম নির্ধারণে এসইসিকে আরো সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। ফেসভ্যালুতে দর নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে।
দুই বছর আগেও আইপিও ছিল সোনার হরিণ। আইপিওতে একটি লট পাওয়া মানেই ছিল বিনিয়োগের কয়েক গুণ মুনাফা। কিন্তু দিন বদলে গেছে। আইপিও আবেদনে বিনিয়োগকারীদের সেই উদ্দীপনা আর দেখা যায় না। আইপিও আবেদনকারী বিনিয়োগকারীদের ভিড় দেখা যায় না ব্যাংকের লাইনে। ফলে আইপিও পাওয়া এখন অনেক সহজ হলেও তা থেকে মুনাফা পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্যই হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি বাজারে আসা কয়েকটি শেয়ার এমন বার্তাই দিল বিনিয়োগকারীদের।
গত কয়েক মাসে প্রিমিয়ামসহ বাজারে এসেছে আমরা টেকনোলজিস লিমিটেড, ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেড, সায়হাম কটন মিলস লিমিটেড, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কম্পানি লিমিটেড এবং জিবিবি পাওয়ার লিমিটেড।
১৪ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২৪ টাকা ইস্যু মূল্যের আমরা টেকনোলজিসের লেনদেন শুরু হয়েছে গত ৪ জুন। প্রতিটি শেয়ার গতকাল রবিবার সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ২৪ টাকা দরে। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার ২৩ টাকা ৮০ পয়সা দরে লেনদেন হয়।
এদিকে ৬৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৭৫ টাকার ইউনিক হোটেলের শেয়ারের লেনদেন শুরু হয় ২ জুন থেকে। প্রথম দিন ৭৮ টাকা দরে লেনদেন হয়। পরের দুদিন দর কমে ইস্যু মূল্যের কাছাকাছি চলে আসে। গতকাল রবিবার সর্বশেষ লেনদেন শেষ হয় ৭৭ টাকা ৮০ পয়সায়। গত ২৪ জুন সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেন শুরু হয়েছে সায়হাম কটনের। শুরুর দিন থেকে ২০ টাকা ইস্যু মূল্যের কমে বিক্রি হয় এর শেয়ার। গতকাল রবিবার ইস্যু মূল্যের নিচে লেনদেন হয়েছে সায়হাম কটনের শেয়ার। এদিন এই শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন হয় ১৮ টাকা ৫০ পয়সা।
বিদ্যুৎ খাতের কম্পানি জিবিবি পাওয়ারের শেয়ারেও লোকসান গুনছেন বিনিয়োগকারীরা। ৪০ টাকা ইস্যু প্রাইসের এ শেয়ারের লেনদেন শুরু হয় গত ১৩ জুন থেকে। শুরুর দিনে ৪৩ টাকা দরে লেনদেন হয়। ২০ জুন লেনদেন হয়েছে ৩৪ টাকা ৩০ পয়সায়। গতকাল রবিবার জিবিবির লেনদেন হয়েছে ৩৮ টাকা ৮০ পয়সা দরে। এর আগে সরকারি শেয়ার বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ৪০০ টাকা প্রিমিয়ামযুক্ত ৫০০ টাকার আরপিওতে আবেদনের পর শেয়ার বরাদ্দ পেয়ে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার বিনিয়োগকারী। গতকাল রবিবার এর শেয়ারের লেনদেন হয়েছে ২৫৩ টাকা দরে।
আইপিওর শেয়ারে লোকসান হওয়া বা কাঙ্ক্ষিত মুনাফা না হওয়ার পেছনে এসইসির কর্মকর্তারা সেকেন্ডারি মার্কেটের মন্দা পরিস্থিতির প্রভাবকে দায়ী করেছেন। তবে বাজার সংশ্লিষ্টরা উচ্চ প্রিমিয়ামকেই দায়ী করছেন। তাঁদের মতে, প্রিআইপিও শেয়ারের প্রাইভেট প্লেসমেন্ট কেনা বড় বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি আংশিক পুষিয়ে দিতেই কম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে এসইসি। বড়দের বাঁচাতে গিয়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে এসইসি।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ওসমান ইমাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ইউনিক হোটেল ও সাব মেরিন কেবলসের শেয়ার আইপিওতে আন্ডারসাবসক্রাইবড (অবিক্রীত) হয়েছে। এর প্রভাব সেকেন্ডারি মার্কেটে পড়েছে। এর জন্য উচ্চ প্রিমিয়াম নির্ধারণ দায়ী হতে পারে। তিনি বলেন, মন্দাবাজারে যেকোনো কম্পানির আইপিওর প্রিমিয়াম নির্ধারণের আগে এসইসিকে আরো বেশি সতর্ক হতে হবে। নইলে প্রাইমারি মার্কেটের ধস শুরু হলে সেকেন্ডারি মার্কেটের পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।
ডিএসইর সাবেক সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, বাজারই শেয়ারের দর নির্ধারণ করে দেয়। এই দর বুঝিয়ে দিল, এসইসি কয়েকটি কম্পানির অতিরিক্ত দর নির্ধারণ করে দিয়েছিল। সেকেন্ডারি মার্কেটের মন্দা প্রাইমারি মার্কেটে পড়েছে।
তিনি বলেন, আইপিওতে ইস্যুকৃত মূল্যের চেয়ে সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেন হলে আইপিওর প্রতি আগ্রহ কমে যাবে। এতে বিভিন্ন কম্পানির শেয়ার আন্ডারসাবক্রাইবড (অবিক্রীত) হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে শেয়ারের সরবরাহের পাইপলাইন থেমে যেতে পারে, যা পুঁজিবাজারের জন্য অশনিসংকেত বয়ে আনতে পারে।
এসইসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সেকেন্ডারি বাজারের মন্দা পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে। তাই প্রাথমিকভাবে ধার্যকৃত শেয়ারের দাম হারাচ্ছে কম্পানি। তিনি বলেন, আইপিওতে ধার্যকৃত দামের দ্বিগুণ দর পেয়েছে_এমন ১০টি কম্পানিরও অনুমোদন দিয়েছে পুনর্গঠিত এসইসি।
এদিকে ওই কয়েকটি কম্পানির দর বিবেচনায় নিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির অপেক্ষায় থাকা আইপিওর বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি করেছেন বিনিয়োগকারীরা। এই কম্পানিগুলো ইতিমধ্যে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের অনুমোদন পেয়ে ডিএসইর তালিকাভুক্তির জন্য অপেক্ষায় রয়েছে।
পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, আইপিওর আবেদন করা কম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম নেওয়ার সুযোগ বন্ধ রেখে শুধু ফেসভ্যালুতে আইপিওর অনুমোদন দেওয়া উচিত।
সূত্র: কালের কণ্ঠ, ৯ জুলাই ২০১২