আইপিও অনুমোদনে প্রাধান্য পাচ্ছে না মৌলভিত্তির কোম্পানি

শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহে ইচ্ছুক মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদনে প্রাধান্য পাচ্ছে না। মূলত মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর আয় অনুযায়ী শেয়ারপ্রতি বরাদ্দ মূল্য বেশি হওয়ায় তাদের আবেদনে সাড়া দিচ্ছে না বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। অন্যদিকে অভিহিত মূল্য ও অল্প প্রিমিয়ামে তুলনামূলক দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির আইপিও অনুমোদনে বাজারঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জের পর্যবেক্ষণও আমলে নিচ্ছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
নাভানা রিয়েল এস্টেট, অটবি, ইফাদ অটোস, সাইফ পাওয়ারটেক, একমি ল্যাবরেটরিজের মতো কোম্পানিগুলো প্রায় দেড় বছর আগে আইপিও আবেদন করেও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। সময়মতো অর্থ সংগ্রহের ব্যর্থতায় হতাশ কোম্পানিগুলো বিকল্প পথে অর্থ সংস্থানের প্রক্রিয়া শুরু করছে। এরই মধ্যে কোনো কোনো কোম্পানি আইপিও প্রক্রিয়া স্থগিতও করেছে। অভিযোগ উঠেছে, শেয়ারপ্রতি বরাদ্দ মূল্য নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় এসব কোম্পানির আইপিও আটকে গেছে। এর আগে স্থির মূল্য পদ্ধতিতে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠনের সুপারিশ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। তবে বিএসইসির আইনে মূল্য নির্ধারণের কোনো সুযোগ নেই বলে এ ধরনের কমিটি গঠন যথাযথ নয় বলে মনে করে কমিশন। আগের কমিশনের সদস্যদের নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক থাকলেও গ্রামীণফোন, বার্জার, ম্যারিকোর মতো মৌলভিত্তি রয়েছে— এমন কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। আর বর্তমান কমিশনের উল্লেখযোগ্য সাফল্য বলতে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলের তালিকাভুক্তি। বরং দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানি অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স লিমিটেডের আইপিও অনুমোদন দিয়ে বিপাকে পড়েছে কমিশন। এছাড়া অর্থের প্রয়োজন নেই, এমন কোম্পানিকেও আইপিও অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এতে কমিশনের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। মৌলভিত্তির কোম্পানির আইপিও অনুমোদন না পাওয়ায় এ বছর তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী কোম্পানির সংখ্যাও কমে গেছে।
দেশের নির্মাণ খাতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি নাভানা রিয়েল এস্টেট শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য ২০১১ সালের ২০ ডিসেম্বর আইপিও আবেদন করে। কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি বরাদ্দ মূল্য ১২০ টাকায় আবেদন জানানোয় দেড় বছরেও আইপিও আবেদনের কোনো অগ্রগতি হয়নি। একইভাবে শেয়ারপ্রতি ১০ টাকা ৮১ পয়সা আয় দেখিয়ে শীর্ষস্থানীয় গাড়ি আমদানিকারক ও বাজারজাতকরণ প্রতিষ্ঠান ইফাদ অটোস শেয়ার ছাড়ার আবেদন জানায়। তবে ২০১২ সালের ২৬ জানুয়ারি এ আবেদন জানালেও আইপিও অনুমোদন পায়নি কোম্পানিটি। ১ বছর ১০ মাস আগে অর্থ সংগ্রহের আবেদন জানালেও সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড অনুমোদন পায়নি। কোম্পানিটি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারপ্রতি আয় দেখিয়েছে ৪ টাকা ১০ পয়সা। বরাদ্দ মূল্য চেয়েছে ৩৫ টাকায়।
গত বছরের এপ্রিলে দেশের অন্যতম বড় ওষুধ উত্পাদনকারী কোম্পানি একমি ল্যাবরেটরিজ শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির আবেদন জানায়। কোম্পানিটি প্রতি শেয়ারের বরাদ্দ মূল্য ৬০ টাকা নির্ধারণের আবেদন জানায়। ফার্নিচার খাতের সেরা কোম্পানির মধ্যে অন্যতম অটবি লিমিটেড প্রতি শেয়ারের বরাদ্দ মূল্য চেয়েছে ৪৫ টাকা। কিন্তু বছর পার হলেও এসব কোম্পানির আইপিও আবেদনে কোনো সাড়া দেয়নি বিএসইসি। একই অবস্থা তৈরি হয়েছে বিদ্যুত্ খাতের পাঁচ কোম্পানির আইপিও আবেদনে। প্রায় আড়াই বছর পার হলেও নানা জটিলতায় আটকে গেছে ্এনার্জিপ্রিমা লিমিটেডর আইপিও।
এদিকে তুলনামূলক দুর্বল কোম্পানি আইপিওর অনুমোদন পেলেও আটকে আছে মৌলভিত্তির কোম্পানি রয়্যাল ডেনিম, শাশা ডেনিম, মতিন স্পিনিং মিলস লিমিটেড, জেনুইটি সিস্টেমসের আইপিও প্রস্তাব।
নাভানা রিয়েল এস্টেটের আইপিও প্রক্রিয়ায় যুক্ত একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বরাদ্দ মূল্য নির্ধারণ-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে কোম্পানিটির আইপিও অনুমোদন পায়নি। বিএসইসি আমাদের প্রস্তাবিত শেয়ারের বরাদ্দ মূল্য অনেকটাই কমাতে বলেছে। আমরা তাদের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় আইপিওটি আটকে গেছে।’ তিনি বলেন, শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে না পেরে বিকল্প হিসেবে তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন।
একই অবস্থা দেখা গেছে, একমি ল্যাবরেটরিজসহ অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রে। এসব কোম্পানি আইপিও আবেদনের পর শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের অনুমোদন না পেয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিএসইসির কমিশনার আরিফ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যারা আগে আবেদন করেছেন, তাদের আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করে কমিশন। আমরাও চাই মৌলভিত্তি ও ব্র্যান্ড ভ্যালু রয়েছে— এমন কোম্পানিকে দ্রুত তালিকাভুক্তি করতে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির হালনাগাদ আর্থিক প্রতিবেদন দাখিলে ব্যর্থতা, কর্মচারীদের মধ্যে শেয়ার বিতরণে জটিলতা, পরিচালকদের সিআইবি ক্লিয়ারেন্স আনতে দেরি হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে আইপিও অনুমোদনে বিলম্ব হতে পারে।
এদিকে আইপিও অনুমোদনে দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মূল্যায়ন বা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন আমলে নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে বিএসইসির বিরুদ্ধে। গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ আমলে না নেয়ায় প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের জন্য আবেদন করা প্রসপেক্টাসে অসঙ্গতি নিয়েই বিভিন্ন কোম্পানি তালিকার্ভুক্ত হচ্ছে। ফলে তালিকাভুক্তির পর পরই কোনো কোনো কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে না পারায় ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থান পাচ্ছে।
শেয়ারবাজার ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে তালিকাভুক্ত হতে ইচ্ছুক কোম্পানির সার্বিক অবস্থা মূল্যায়ন করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থারই সাবেক দুই চেয়ারম্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজ্ঞদের দ্বারা নিরপেক্ষ আইপিও আবেদন পর্যালোচনা প্যানেল গঠন করেছিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ আমলে না নেয়ায় এরই মধ্যে ডিএসই সেই প্যানেল বিলুপ্ত করেছে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা না চাইলে আর কোনো পর্যবেক্ষণ বা মূল্যায়ন প্রতিবেদন না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্টক এক্সচেঞ্জটি।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি কোম্পানির আইপিও আবেদন বিবেচনা করার জন্য দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মূল্যায়ন প্রতিবেদন যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হতো।
আইপিও পর্যালোচনায় দেখা যায়, কমিশনের অনুমোদন পাওয়া পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে না পারায় এরই মধ্যে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছে। আর ফ্যামিলিটেক্স নামে সদ্য তালিকাভুক্ত কোম্পানি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
বিভিন্ন কোম্পানি সম্পর্কে ডিএসইর প্যানেল কমিটির দেয়া মূল্যায়নপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আইপিওর অনুমোদন পাওয়া গোল্ডেন হারভেস্ট এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ম্যাথিউ গ্রাহাম স্টক টাকা ছাড়াই বিপুল পরিমাণের শেয়ারের মালিক হয়েছেন। কোম্পানিতে ম্যাথিউ গ্রাহাম স্টকের যে ১৩ লাখ শেয়ার রয়েছে, এর মধ্যে ১১ লাখ ২৫ হাজার শেয়ারের বিপরীতে অর্থ জমা দেখাতে পারেননি। ডিএসইর আইপিও-সংক্রান্ত প্যানেল কমিটি তাদের মূল্যায়নপত্রে এ অভিযোগ তুললেও তার সুরাহা না করেই কোম্পানিটির আইপিও অনুমোদন দেয় বিএসইসি। এছাড়া কোম্পানিটি তার অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গোল্ডেন হারভেস্ট সি ফুড অ্যান্ড ফিশ প্রসেসিংয়ের অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে বিনিময় মূল্য, স্কিম অফ একুইজিশন, মূল্যায়ন প্রতিবেদন ইত্যাদি প্রয়োজনীয় কাগজ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনেও অস্বচ্ছতা রয়েছে।
বেঙ্গল উইন্ডসর থার্মোপ্লাস্টিক লিমিটেডের শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের কোনো প্রয়োজন ছিল না বলে মনে করে প্যানেল কমিটি। কোম্পানিটির প্রসপেক্টাস পর্যালোচনা করে কমিটি দেখতে পায়, কোম্পানিটি আইপিওর অর্থ ব্যবহারে উল্লেখ করেছে যে, ১০ কোটি টাকার ব্যাংকঋণ পরিশোধ করা হবে। অথচ ব্যাংকে কোম্পানির নামে ২০ কোটি ৯২ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে। এছাড়া কোম্পানিটি তার দুই অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বেঙ্গল পলি অ্যান্ড পেপার স্যাক ও বেঙ্গল প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার কেনার জন্য ২০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেও এখন পর্যন্ত ওই দুই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার পায়নি। এমনকি বিনিয়োগের বিপরীতে লভ্যাংশও পায়নি। কোম্পানির মৌলভিত্তি অনুযায়ী এর শেয়ারপ্রতি বরাদ্দ মূল্য ২৫ টাকার কম হওয়া উচিত বলে মনে করে প্যানেল কমিটি।
এছাড়া বিএএস লঙ্ঘন করে গ্লোবাল হেভি কেমিক্যালস অন্যান্য বছরের চেয়ে গত বছর লভ্যাংশ ও শেয়ারপ্রতি আয় বাড়ানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে অবচয় হার কমিয়ে দেখিয়েছে। আর পরিচালন মূলধনে ঘাটতিতে থাকা কোম্পানি বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেডের আইপিও অনুমোদন দিয়েছে বিএসইসি। সবশেষ পাঁচ বছরের মধ্যে চার বছরই কোম্পানির পরিচালন মূলধন ঘাটতি রয়েছে। এতে কোম্পানির আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে। এসব গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। এছাড়া দেশের অধিকাংশ জেলায়ই উত্পাদিত ওষুধ পাওয়া না গেলেও আইপিও অনুমোদন পেয়েছে সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যাল নামের এক অখ্যাত কোম্পানি। শুধু জেলা শহর নয়, সরকারি-বেসরকারি কোনো হাসপাতালই এ কোম্পানির ওষুধ ক্রয় করে না।
তবে নিয়ম মেনেই এসব আইপিওর অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে মনে করেন বিএসইসির কমিশনার আরিফ খান। তিনি বলেন, ‘আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে আমরা নীরিক্ষা প্রতিবেদন, মার্চেন্ট ব্যাংকের ডিউডিলিজেন্স সার্টিফিকেটের ওপর নির্ভর করে থাকি। এর বাইরেও যদি কারো কোনো মূল্যায়ন অথবা অভিযোগ থাকে, অবশ্যই আমরা তা আমলে নেব। এছাড়া ডিএসই যদি আমাদের কাছে তাদের পর্যবেক্ষণ পাঠায়, তাও আমরা মূল্যায়ন করব।’
বণিক বার্তা
This entry was posted in Uncategorized on by .

About bdipo Team

Started our journey in Jan 2009. A simple idea is getting bigger. A baby born and learning to walk, talk, imitate and express. This page is dedicated to that eternal urge of expression. The humane and emotional side of bdipo.