উচ্চ প্রিমিয়াম রোধে ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং এ্যাক্ট প্রণয়ন জরুরী

প্রিমিয়ামসহ শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ এ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশনের কোন কর্তৃত্ব নেই। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) আবেদন করা কোম্পানিগুলো উচ্চ হারে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করে চার্টার্ড এ্যাকাউন্ট ফার্র্ম ও ইস্যু ম্যানেজারের সহযোগিতায়। চার্টার্ড এ্যাকাউন্ট ফার্মগুলো সম্পদ মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। কিন্তু কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনের অসঙ্গতি খুঁজে বের করার দায়িত্ব অডিটর ফার্মগুলোর। বাজারের মন্দাবস্থার কারণে সম্প্রতি নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো দুয়েক দিন পরেই নেতিবাচকভাবে লেনদেন শুরু করে। আর এই কারণে ফাইনান্সিয়্যাল রিপোর্টিং এ্যাক্ট জরুরীভিত্তিতে প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা। এটি বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাবে বলে তারা মনে করছেন।
এর আগে পুঁজিবাজারে অনেক কোম্পানি উচ্চহারে প্রিমিয়াম নিয়ে বাজারে এসে নির্ধারিত মূল্যের নিচে লেনদেন শুরু করে। আইপিওয়ে শেয়ার পাওয়া বিনিয়োগকারীরা এতে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশের প্রধান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইউনিক হোটেল এ্যান্ড রিসোর্টও লেনদেনের দ্বিতীয় দিনেই বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে। যদিও লেনদেনের প্রথম দিনেই কোম্পানিটির লেনদেন বেশি হলেও বিনিয়োগকারীদের আশাবাদী করতে পারে। দ্বিতীয় দিনে কোম্পানিটির দর আগের দিনের চেয়ে ২ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। একইভাবে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেডও বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন লেনদেনের প্রথম দিনেই এ ক্যাটাগরি থেকে জেড ক্যাটাগরিতে লেনদেন হচ্ছে। মঙ্গলবার এই কোম্পানিটিকে নিয়ে ডিএসই ও চট্টগ্রাম স্টক একচেঞ্জে (সিএসই) বৈঠকও করেছে।
জানা গেছে, গত রবিবার এসইসি ও সিএসইর বৈঠকে কমিশন চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন উচ্চ হারে প্রিমিয়ামের প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। বৈঠকে উপস্থিত সিএসইর এক উর্ধতন কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে এসইসির চেয়ারম্যান স্টক একচেঞ্জের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেন, এসইসি কোম্পানির তালিকাভুক্তির জন্য প্রিমিয়াম নির্ধারণ করে না। কোম্পানিগুলোর সিএ ফার্ম, ইস্যু ম্যানেজার ও অডিটর ফার্মগুলো এটি নির্ধারণ করে থাকে। তাদের প্রতিবেদনেই এসব উল্লেখ থাকে। এগুলো খতিয়ে দেখতে ফিনান্সিয়াল রিপোর্টিং এ্যাক্ট জরুরী। অচিরেই এটির কাজ শুরু করা হবে।
এদিকে বাজারে স্থিতিশীলতার স্বার্থে কোম্পানিগুলোকে উচ্চহারে প্রিমিয়াম নিয়ে আইপিওয়ের অনুমোদন না দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ডিএসইর প্রেসিডেন্ট রকিবুর রহমান। তিনি আরও জানান, এর আগে বেশ কিছু কোম্পানি উচ্চ হারে প্রিমিয়াম নিয়ে অতি মূল্যায়িত হয়ে বাজারে ঢুকেছে। এছাড়া কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনেও কিছুটা তথ্যগত সমস্যা থাকে। এগুলোকে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করতে ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল গঠনের দাবিও জানান তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত চলতি অর্থবছরের (২০১১-২০১২) বাজেট প্রস্তাবে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন ও ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও এখন পর্যন্ত তার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পুঁজিবাজারে কারসাজি বন্ধ করার লক্ষ্যে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর এ উদ্যোগ নেয়া হলেও এখন পর্যন্ত কেন তা বাস্তবায়ন করা হয়নি এমন প্রশ্ন বাজার সংশ্লিষ্টদের।
সরকার কর্তৃক ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন ও ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার সংশ্লিষ্টরা মনে করেছিলেন, অবশেষে বন্ধ হতে যাচ্ছ অডিট ফার্মগুলোর প্রকাশিত উদ্দেশপ্রণোদিত অডিট রিপোর্ট তৈরির কার্যক্রম। কারসাজি বন্ধের লক্ষ্যে এ উদ্যোগ দেরিতে নেয়া হলেও ভবিষ্যতের জন্য সুফল বয়ে আনবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুঁজিবাজারে আসা আগে অনেক কোম্পানি অডিট ফার্মের দ্বারা তাদের অডিট রিপোর্টে মুনাফা দেখিয়ে থাকে। যদিও কোম্পানিটি বাস্তবে লোকসানি অবস্থায় রয়েছে। এমতাবস্থায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ওই অনৈতিকভাবে তৈরি অডিট রিপোর্ট দেখে বিনিয়োগ করে থাকেন। ফলে বাধ্যতামূলকভাবে লোকসান গুনতে হয় বিনিয়োগকারীদের। তবে এ আইন কার্যকর হলে বিভিন্ন কোম্পানি প্রকাশিত অডিট রিপোর্টগুলোর মনোনয়ন হবে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
এর আগে ১০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়ে ২০০৫ সালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় সর্বপ্রথম এ আইন প্রণয়ন করার উদ্যোগ নেয়া হয়ে ছিল। এমনকি আইনটির একটি খসড়াও তৈরি করা হয়। কিন্তু পরে তা স্থগিত করা হয়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে আবারও আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় আইন প্রণয়ন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। ২০০৫ সালে আইনটি তৈরি করতে ১০ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে আইন প্রণয়নে ৪ কোটি টাকা এবং বাকি ৬ কোটি টাকা ফাইন্যান্সিয়াল কাউন্সিল পরিচালনার জন্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু আইন প্রণয়ন স্থগিত হওয়ায় বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া অর্থ যথাসময়ে ফেরত দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সাবেক প্রেসিডেন্ট ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ বলেন, সরকার ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন ও ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল গঠনের যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সিএসই বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে প্রস্তাব করে এসেছে। সিএসই’র বিশ্বাস এ পদক্ষেপ তালিকাভুক্ত কোম্পানিরগুলোর ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং বাজারে স্বচ্ছতা আসবে। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর এখনও কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না তা আমার জানা নেই।

সূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ, ৪ জুলাই, ২০১২