বুকবিল্ডিং পদ্ধতি স্থগিত নয়, প্রয়োজন কার্যকর সংস্কার

টানা বিপর্যয়ের পর দেশের পুঁজিবাজারে আবারও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহের শেষ লেনদেনে বাজারের স্বাভাবিক আচরণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। তবে উলেস্নখযোগ্য হারে দরপতনের পরও অনেক কোম্পানির শেয়ারের দর অতি মূল্যায়িত হয়ে আছে। ফলে একটানা দরবৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে শেয়ারবাজার আবারও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিমুক্ত রাখতে ভাল শেয়ারের যোগান বাড়ানো জরুরী। বিপর্যয়ের ফলে বিনিয়োগকারীদের যে লোকসান হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতেও গ্রহণযোগ্য দরে নতুন শেয়ারের যোগান বাড়ানোকেই সবচেয়ে বড় উপায় বলে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন।
বিশেস্নষণে দেখা গেছে, গত প্রায় দেড় বছর ধরে যৌক্তিক সংশোধন ছাড়াই ধারাবাহিক উর্ধগতির কারণে দেশের পুঁজিবাজার ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মূলত নানা উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হলেও তার সঙ্গে পালস্না দিয়ে শেয়ারের যোগান বাড়াতে না পারার কারণেই অধিকাংশ শেয়ার অতি মূল্যায়িত হয়ে পড়ে। এরপরও নানা ধরনের গুজব ও প্রলোভনের কারণে শেয়ার ধরে রাখেন অধিকাংশ বিনিয়োগকারী। একের পর এক পদৰেপ নিয়েও বাজারের রাশ টানতে ব্যর্থ হয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি। ওই অবস্থায় শেয়ারবাজারে জমে ওঠা পুঁজি উৎপাদনমুখী খাতে স্থানান্তর করে শেয়ারের যোগান বাড়ানো সবচেয়ে জরম্নরী ছিল। কিন্তু কোম্পানির ৪০ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার বাধ্যবাধকতা এবং আমলতান্ত্রিক জটিলতার কারণে উলেস্নখযোগ্য সংখ্যক নতুন ইসু্য বাজারে আসতে পারেনি। এর বিপরীতে বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় তীব্র হয়ে ওঠে ভাল শেয়ারের সঙ্কট। চাহিদা ও যোগানের এই অসামঞ্জস্যতাই বাজারে বিপর্যয়ের পথ তৈরি করে।
পুঁজিবাজারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর পরিস্থিতি সামাল দিতে বুকবিল্ডিং পদ্ধতির কার্যকারিতা স্থগিত রাখার পাশাপাশি প্রক্রিয়াধীন প্রাথমিক গণপ্রসত্মাব (আইপিও) অনুমোদনে ধীরে চলার নীতি অবলম্বন করছে সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এর ফলে পুঁজিবাজারে আসার অপেৰায় থাকা উলেস্নখযোগ্যসংখ্যক কোম্পানির ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আর সামগ্রিকভাবে বাজারে শেয়ারের যোগান বাড়ানোর প্রচেষ্টায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নানামুখী প্রচেষ্টার সঙ্গে ভাল শেয়ারের যোগান বৃদ্ধির প্রক্রিয়াও অব্যাহত রাখতে হবে বলে বিশেস্নষকদের অভিমত।
পুঁজিবাজারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করতে গিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিকে দায়ী করা হচ্ছে। কারণ বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে এ পর্যনত্ম অনুমোদন পাওয়া সব কোম্পানিই লেনদেন শুরম্নর আগে থেকেই অতি মূল্যায়িত হয়েছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আগেই শেয়ারের অতি মূল্যায়ন রোধ এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজার থেকে অতিরিক্ত অর্থ স্থানানত্মরের সুযোগ বন্ধে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে বুক বিল্ডিং পদ্ধতির কার্যকারিতা স্থগিত করেছে সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এর ফলে ৪৮টি কোম্পানির শেয়ারবাজারে আসার প্রক্রিয়া থমকে গেছে।
জানা গেছে, নির্ধারিত মূল্য পদ্ধতিতে বাজারে আসার প্রক্রিয়ায় থাকা কোম্পানিগুলোর ৰেত্রেও ধীরে চলার নীতি অবলম্বন করছে এসইসি। টানা দরপতনের প্রেৰিতে সালভো কেমিক্যালের আইপিও আবেদন গ্রহণের সময় পিছিয়ে দেয়া হয়। এছাড়া সব কিছু চূড়ানত্ম হওয়ার পরও কয়েকটি কোম্পানির আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেয়া হয়েছে।
বিশেস্নষকরা মনে করেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকি কমাতে হলে শেয়ারের যোগান বাড়ানোই হবে সবচেয়ে বড় সমাধান। কারণ বাজারে শেয়ারের মূল্য ও আয়ের গড় অনুপাত এখনও ২০-এর বেশি। এছাড়া সূচক যে অবস্থানে রয়েছে তাতে কয়েকদিন টানা বৃদ্ধিতেই বিপর্যয়ের আগের অবস্থানে চলে যেতে পায়ে। এতে বাজারে আরেক দফা বড় দরপতনের ঝুঁকি বাড়বে। এ অবস্থায় সহনীয় ও গ্রহণযোগ্য মূল্যে নতুন শেয়ারের যোগান বাড়াতে পারলে বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বাজারের জন্যও তা ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
বাজার সংশিস্নষ্টরা মনে করেন, বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বাড়াতে হলে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে বুকবিল্ডিং পদ্ধতি পুনরায় কার্যকর করতে হবে। পেস্নসমেন্টের মাধ্যমে শেয়ার বরাদ্দের সুযোগ বন্ধ ও দর প্রসত্মাবে (বিডিং) বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের লক ইনের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হলে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে কারসাজির প্রবণতা অনেকটাই কমে যাবে। পাশাপাশি এসইসির হাতে শেয়ারের নির্দেশক মূল্য সংশোধনের সুযোগ রাখা হলে অতি মূল্যায়িত হয়ে বাজারে আসার পথ বন্ধ হবে।
তাদের মতে, বুকবিল্ডিং পদ্ধতি স্থগিত করে রাখলে প্রক্রিয়াধীন থাকা ৪৮টি কোম্পানির পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এতে পুঁজিবাজারে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার শেয়ার সরবরাহ বন্ধ হবে। এতে তীব্র শেয়ার সঙ্কট থেকে সৃষ্ট বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে সাময়িক উত্তরণ সম্ভব হলেও তা টেকসই করা যাবে না।

Source: The daily janakantha, 30 Jan, 2011