ঋণগ্রস্ত কোম্পানি শেয়ারবাজারের জন্য বোঝা

আইপিওর মাধ্যমে ঋণগ্রস্ত কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া বাড়তি বোঝা বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বাজারে শেয়ার জোগানের সাথে চাহিদার সামঞ্জস্যতা থাকা প্রয়োজন; কিন্তু মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিকে আইপিওর মাধ্যমে বাজারে আনা না গেলে ওইসব ঋণগ্রস্ত কোম্পানি বাজার এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এ অবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে যেসব কোম্পানিকে আইপিওর মাধ্যমে ঋণ পরিশোধ এবং কোনো কোনো কোম্পানিকে অযৌক্তিক প্রিমিয়াম দেয়া হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে বাজারকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাই আর কোনো ঋণগ্রস্ত কোম্পানি নয়, মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানি বাজারে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর উদ্যোগ নেয়া উচিত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, ইনিশিয়াল পাবলিক অফারে (আইপিও) আসা কোম্পানি ঋণগ্রস্ত হয়ে তালিকাভুক্ত হতে আসে। আর এসব ঋণগ্রস্ত কোম্পানিকে ইস্যুয়ার, অডিটর ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্টস ফার্মের সংশ্লিষ্টরা আর্থিক প্রতিবেদন মোটাতাজা করে ভালো ইপিএস প্রসপেক্টাসে প্রদর্শন করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে পেশ করে। এরপর তৈরি করা ওই ভালো ইপিএসের দোহাই দিয়ে ভালো প্রিমিয়াম আদায় করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাথে দরকষাকষি হয়। একপর্যায়ে উভয়ের সম্মতিতে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি। এ অবস্থায় ফেস ভ্যালুর সাথে প্রিমিয়াম নেয়ার ক্ষেত্রে ওই কোম্পানি পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের পূর্বে প্রেরিত পারফরমেন্স এবং আর্থিক প্রতিবেদন দিনে দিনে রুগ্ণ হয়ে না যায়, সেজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কোম্পানি ইস্যুয়ার, অডিটর ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্টস ফার্মের নিশ্চয়তা অপরিহার্য হওয়া উচিত।

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, শেয়ারবাজারে যেসব কোম্পানি ঋনগ্রস্ত হয়ে বাজারে আসে। সেসব কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা সন্দিহান হয়ে পড়েন। কারণ কোম্পানির সংশ্লিষ্ট অসৎ কর্মকর্তারা এ টাকা নিজেদের মধ্যে আয়েশী জীবন ধারণে ব্যয় বা এফডিআরের মাধ্যমে ব্যবসা করে থাকে। এছাড়া প্রিমিয়াম নেয়া কোম্পানিগুলো তাদের মোট সম্পদকে অনেক বেশি বাড়িয়ে বাজারে আসার পর দুয়েক বছর আর্থিক প্রতিবেদন ভালো দেখানোর পর ধীরে ধীরে রুগ্ণতার দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু কেন কোম্পানি এ ধরনের রুগ্ণতার মুখে পড়ে সে খবর কেউ রাখে না।

কয়েকজন বড় ব্যক্তি বিনিয়োগকারী জানান, গত এক বছরে যেসব কোম্পানি প্রিমিয়ামসহ বাজারে এসেছে সেসব কোম্পানির অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় পর্যায়ে রয়েছে। মূলত এসব (বেঙ্গল উইন্ডসোর থার্মাপ্লাস্টিক লি., জিপিএইচ ইস্পাত, গোল্ডেন হারভেস্ট এগ্রো ইন্ডাস্ট্র্রিজ লি., জিবিবি পাওয়ার, গ্লোবাল হেভি কেমিক্যাল লি., ওরিয়ন ফার্মা, আরগন ডেনিমস, জেনারেশন নেক্সট, ফ্যামিলি টেক্স, অ্যাপোলো ইস্পাত, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, সেন্ট্রাল ফার্মা) কোম্পানি বাজার আসার এক মাসের মধ্যে শেয়ারের দর অনেক উঁচুতে তুলে ধীরে ধীরে তলানিতে নেমে আসছে। এতে বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছে। এ অবস্থায় কোম্পানির প্রিমিয়াম দেয়ার ক্ষেত্রে শতভাগ লোন পরিশোধ নয়, ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে এবং লোন সঠিকভাবে সংশ্লিষ্টরা ব্যবহার করছে কি না সেটা বিএসইসিকে নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিষয়ে কয়েকটি মিউচুয়্যল ফান্ডের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে এলে অবশ্যই ভালো প্রিমিয়াম বিবেচিত হবে। আবার অখ্যাত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন মোটাতাজা করে ভালো ইপিএস দেখিয়ে প্রিমিয়াম নেয়ার ক্ষেত্রে কঠোর পন্থা অবলম্বন করতে হবে। এছাড়া যারা লোন পরিশোধের জন্য প্রিমিয়াম দাবি করে, তাদের প্রিমিয়াম দেয়া উচিত নয়।

এ বিষয়ে কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে কোনোভাবে প্রিমিয়াম দেয়া উচিত নয়। এছাড়া একসঙ্গে একাধিক কোম্পানির আইপিও অনুমোদন ও চাঁদা সংগ্রহ বর্তমান বাজারকে দুর্বল করতে পারে। কারণ এ টাকা বাজার থেকে বের হয়ে যায়। এতে বাজারে পূর্বের ন্যায় তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে বাজারের শেয়ারের চাহিদার সাথে সরবরাহের মিল রেখে বহুজাতিক কোম্পানি বা দেশীয় ভালো মুনাফায় থাকা কোম্পানিগুলো আনা উচিত। এতে ভালো কোম্পানিগুলোর মধ্যে শেয়ারবাজারে আসার আগ্রহ সৃষ্টি হবে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের এক নেতা জানান, আইপিওতে আসা কোনো কোম্পানিকে প্রিমিয়াম দেয়া হলে ওই কোম্পানির সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে খোঁজ খবর নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এ নেতা আরো জানান, লোন পরিশোধের জন্য যেসব কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসে, সে কোম্পানি কখনো ভালো পারফরমেন্স দেখাতে পারে না। একপর্যায়ে এ কোম্পানি লোকসান দেখাতে দেখাতে জেড ক্যাটাগরিতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 

 

শেয়ারনিউজ২৪