অ্যাপোলোর আইপিও স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হচ্ছে

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ প্যানেলের পর্যবেক্ষণ আমলে না নিয়ে অ্যাপোলো ইস্পাতের আইপিও অনুমোদন দিয়েছিল বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কিন্তু হঠাৎ করেই অর্থমন্ত্রীর এক চিঠিতে মাথায় হাত উঠে বিএসইসির। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেনকে চিঠি লেখেন।

ওই চিঠিতে কোম্পানিটিকে বদমায়েশ বলে উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। বিএসইসির চেয়ারম্যানের কাছে দেয়া চিঠিতে অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, কোম্পানিটি আইপিওতে যাওয়ার ব্যাপারে তার কাছে নালিশ এসেছে। বেশ কিছুদিন থেকে কোম্পানিটি অচল। আইপিওর মাধ্যমে তারা বেশ কিছু সম্পদ লুটের আয়োজন করে। তারা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেশ কিছু লোকের দাবি-দাওয়া মেটাতে পারে না। কোম্পানিটি এনবিআরের কর খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। বিষয়টি নিয়ে মামলা চলছে। তাই তাদের ব্যাপারে তদন্ত করা উচিত।

অর্থমন্ত্রী বলেন, তদন্তের মধ্যে ৪টি বিষয় উল্লেখ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে, বিতাড়িত শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ, রাজস্ব বোর্ডে দেনা, লোকাল এলসির মাধ্যমে তারা কি রকম চুরি-চামারি করেছে সে ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা এবং প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশ। পরবর্তী সময়ে ১২ ফেব্রুয়ারি অর্থমন্ত্রীর নির্দেশে বিএসইসি কোম্পানির আইপিও প্রক্রিয়া স্থগিত করে।

একই সঙ্গে, অর্থমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনা অনুসারে চারটি বিষয়ে তদন্ত কাজ শুরু করে। কিন্তু মন্ত্রী নিজেই এক মাসের ব্যবধানে তার অবস্থান পরিবর্তন করেন।

পরবর্তী সময়ে কোম্পানির জের তদবিরে অর্থমন্ত্রী নিজের অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ান। পরে তিনি আবারও বিএসইসির চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি লেখেন।

অর্থমন্ত্রীর অবস্থান তুলে ধরে তার একান্ত সচিব ড. আবুল হাসান স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি চিঠি বিএসইসির চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘হলদিয়া শিপিংয়ের এসআর চৌধুরী কোম্পানির আইপিও নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করেছেন। আমি তাদের বলেছি, আমার পরামর্শক্রমে বিএসইসি চেয়ারম্যান এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়েছেন। বিএসইসি আইপিও ইস্যু অনুমোদন করেছে এবং তাদের বিচার বিবেচনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর কমিশন অ্যাপোলো ইস্পাত লিমিটেডকে ১০ টাকা অভিহিতমূল্যের সঙ্গে ১২ টাকা প্রিমিয়ামসহ মোট ১০ কোটি শেয়ার ছেড়ে ২২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করার অনুমতি দেওয়া হয়।

এরআগে আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে ডিএসইর কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ আমলে না নিয়েই অনুমোদন দিয়েছিল বিএসইসি। কোম্পানির প্রসফেক্টাস জমা দেয়ার পর ডিএসইর পক্ষ থেকে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন বিএসইতিতে জমা দেয়া হয়। কোম্পানির উচ্চ প্রিমিয়াম এবং অপারেশন বন্ধ থাকার কথা জানানো হয়। এছাড়াও প্রতিবেদনে কোম্পানিটির বিভিন্ন অসঙ্গতির ব্যাপারে এক্সপাট প্যানেলের মূল্যায়ন হুবহু বিএসইসিকে জানানো হয়। কিন্তু বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি কমিশন।

এছাড়াও প্রতিবেদনে কোম্পানিটির বিভিন্ন অসঙ্গতির ব্যাপারে এক্সপাট প্যানেলের মূল্যায়ন হুবহু বিএসইসিকে জানানো হয়। কিন্তু বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি কমিশন। প্রসঙ্গত, কোন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে বিগত তিন বছরে মুনাফা থাকতে হবে। কোনভাবেই লোকসানে থাকা যাবে না। কোম্পানির আইপিও প্রক্রিয়া স্থগিতের পর কোম্পানির পক্ষ থেকে আইপিও প্রক্রিয়া চালুর জন্য নানা জায়গার তদ্বির করা হয়। অবশেষে উৎপাদন বন্ধ থাকা দুর্বল এ কোম্পানিকে বাজার থেকে ২২০ কোটি টাকা লুটে নেয়ার সুযোগ করে দিলেন মন্ত্রী।

কমিশনের পক্ষ থেকে তদন্তের জন্য দেওয়া অর্থমন্ত্রীর ৪টি বিষয়ে খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয় কমিশন। এলসি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত এবং ঋণ খেলাপি কি না তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছের জানতে চাওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। ওই প্রতিবেদনে উলে�খ করা হয়েছে, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকে অ্যাপোলো ইস্পাত দেনা হয়েছে ৪৩৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি ঋণ খেলাপী এবং বেশিরভাগ ঋণই নিুমান এ পরিনত হয়েছে। কিছু ঋণ মন্দ ও ক্ষতিজনক হিসেবে শ্রেনীকৃত করা হয়েছে। কোম্পানিটি উৎপাদনে থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকঋণ শোধ করছে না বলে উলে�খ করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে। ১৭টি ব্যাংকের ১৮টি শাখায় এ ঋণ রয়েছে অ্যাপোলো ইস্পাতের। এরমধ্যে তিনটি শাখায় বেশি লেনদেন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও ওই তিনটি শাখায় পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করে।

অ্যাপোলো ইস্পাতের ঋণের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মন্তব্যে বলা হয়েছে, ‘ব্যাংকের শাখাগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। সে ক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যমে বাংকের ঋণ পরিশোধের কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না’। অর্থমন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে কোম্পানিটি ঋণখেলাপী। ঋণ খেলাপী প্রতিষ্ঠান আইপিওতে আসতে পারে কি না তা ভেবে দেখার বিষয়।

জানা গেছে, গত কমিশন বৈঠকে কোম্পানির স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করতে চেয়েছিল। কিন্তু আইনী জটিলতা সংক্রান্ত্র কিছু কাগজ ঠিক সময়ে কমিশনে জমা দিতে না পারায় স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করতে পারেনি কমিশন। আগামী কমিশন বৈঠকে এ কোম্পানির স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হচ্ছে বলে সংশি�ষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিশেষ প্রতিনিধি
শেয়ারনিউজ ২৪