সরকারী কোম্পানিগুলোর শেয়ার ছাড়ার ঘোষণা কাজে আসছে না

দেশের পুঁজিবাজারে সরকারী কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির কাজ চলছে ঢিমেতালে। জাতীয় সংসদসহ বিভিন্ন সভা-সেমিনারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সরকারী শেয়ার ছাড়ার ঘোষণাও কোন কাজে আসছে না। বাজারের গভীরতা বাড়াতে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের একটাই দাবি ছিল দ্রুত সরকারী কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করা হোক। এই দাবির প্রেক্ষিতেই অর্থমন্ত্রী স্বয়ং ঘোষণা করেছিলেন গত বছরের জুনের মধ্যে ২৬টি সরকারী প্রতিষ্ঠানকে শেয়ার ছাড়তে হবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদও শেয়ার ছাড়ার প্রক্রিয়া শেষ হবে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব কোম্পানির শেয়ার ছাড়তে সরকারের উচ্চ মহলের নির্দেশনা থাকলেও কোম্পানিগুলোর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতাই এটিকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই দীর্ঘ এক বছর পেরিয়ে গেলেও কাজে অগ্রগতি নেই। শুধু তাই নয়, তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়াটি এতটাই ধীরগতিতে এগোচ্ছে যে, চলতি বছরেও এসব কোম্পানির শেয়ার পুঁজিবাজারে আসবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। ডিএসইর সভাপতি রকিবুর রহমান বলেন, সরকারী ও ভাল কোম্পানিগুলোকে জরুরী ভিত্তিতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। এতে বাজারের গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।
তবে কোম্পানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রমিক অসন্তোষ, জ্বালানি সমস্যা, কোম্পানি পুনর্গঠিত না হওয়া, জমির মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা, অডিট ফার্ম নিয়োগে ব্যর্থতাসহ বিভিন্ন কারণে শেয়ার অফলোডের বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।
গত ২০১০ সালের ১৩ জানুয়ারি অর্থমন্ত্রী আগামী ৬ মাসের মধ্যে ২৬টি সরকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে কয়েকটি কোম্পানিকে গত বছরের মে মাসে এবং বাকিগুলোকে জুন মাসের মধ্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে আসতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০১০ সালের ঘোষণা অনুযায়ী শেয়ার ছাড়তে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ২১টি সরকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাজারে ছাড়ার জন্য আবারও সময় বেঁধে দেয়া হয়। বৈঠক শেষে ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় ঠিক করে দেয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুঁজিবাজারে আনতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে বলেও বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরেও সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেয়নি তারা।
ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে সরকারী মালিকানাধীন কোম্পানির শেয়ার পুঁজিবাজারে আসার কোন সম্ভাবনা নেই। আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড সরকারী কোম্পানির শেয়ার পুঁজিবাজারে আনার জন্য দায়িত্ব পেলেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর অনাগ্রহের কারণে ঘোষিত সময়ে শেয়ার অফলোড করা যাবে না বলে জানা গেছে।
তবে শেয়ার ছাড়ার প্রক্রিয়া অগ্রসর করতে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ ফায়েকুজ্জামান সংশ্লিষ্ট সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। প্রতিদিন একটি করে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে সর্বশেষ অবস্থা পর্যালোচনার মাধ্যমে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আপিও’র (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) মাধ্যমে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এদিকে আরপিও’র (পুনঃগণপ্রস্তাবের) মাধ্যমে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) বাজারে শেয়ার ছেড়েছে।
জানা গেছে, নির্ধারিত সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ার ২০১১ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে বাজারে আসার কথা ছিল। একই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের ২৫ শতাংশ শেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্র্যান্ডিং নিয়ে জটিলতার কারণে এ প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। টেলিফোন শিল্প সংস্থা টেশিস) গত বছরের এপ্রিলের মধ্যে শেয়ার ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। ৩০ মের মধ্যে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ার ছাড়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। ৩০ জুনের মধ্যে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ, চিটাগাং ড্রাইডক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, বাংলাদেশ কেবল শিল্প লিমিটেড, এ্যাসেনশিয়াল ড্রাগস এবং হোটেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের (সোনারগাঁও হোটেল) তালিকাভুক্তির সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া বাখরাবাদ গ্যাস ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে এবং টেলিটক ও বিটিসিএল সেপ্টেম্বরের মধ্যে এবং কর্ণফুলী পেপার মিলকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাজারে শেয়ার ছাড়ার সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেড এবং বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডকে ৬ মাসের মধ্যে শেয়ারবাজারে বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহের জন্য বলা হয়েছে। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু সেতু ও পদ্মা সেতুর জন্য যৌথভাবে জুন বা জুলাই মাসের মধ্যে শেয়ার ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। পাঁচ তারকা হোটেলটি দীর্ঘদিন শেরাটন ব্র্যান্ডের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছিল। সম্প্রতি শেরাটন কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থাপনা থেকে সরে যাওয়ায় হোটেলের নাম পরিবর্তন করে ‘রূপসী বাংলা’ রাখা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক কোন প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড নাম ব্যবহারের চেষ্টা করছে সরকার। এ বিষয়ে সরকারী আদেশের পর নতুন শেয়ার ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে এখন পর্যন্ত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি, জালালাবাদ গ্যাস কোম্পানি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল), টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস), চিটাগাং ড্রাইডক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, বাংলাদেশ কেবল শিল্প লিমিটেড, এ্যাসেনশিয়াল ড্রাগস, বাখরাবাদ গ্যাস, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস, রুরাল পাওয়ার, হোয়েকস্ট বাংলাদেশ লিমিটেড, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রমোশন ডেভেলপমেন্ট, মিরপুর সিরামিকস এবং হোটেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের (সোনারগাঁও হোটেল) শেয়ার ছাড়ার বিষয়ে কোন অগ্রগতি নেই। অন্যদিকে লোকসান কাটিয়ে উঠতে না পারায় আপাতত শেয়ারবাজারে আসতে পারছে না ছাতক সিমেন্ট, কর্ণফুলী পেপার মিলস, জিএম কোম্পানি এবং বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি লিমিটেড। সরকারী শেয়ার ছাড়ার বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, অর্থমন্ত্রী বার বার ঘোষণা দিলেও সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ার বাজারে আসেনি। ডিসেম্বরের আগে শেয়ারগুলো আনা সম্ভব হলে বাজারে পতনটা এত তীব্র হতো না। বর্তমানে বাজারে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতেও সরকারী কোম্পানির শেয়ার ছাড়ায় কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ, ২৪ জুন ২০১২

This entry was posted in News and tagged on by .

About bdipo Team

Started our journey in Jan 2009. A simple idea is getting bigger. A baby born and learning to walk, talk, imitate and express. This page is dedicated to that eternal urge of expression. The humane and emotional side of bdipo.