ওরিয়নসহ ৬ কোম্পানি অবৈধ প্লেসমেন্টে হাতিয়ে নিল ১৫৭২ কোটি টাকা

প্রাইভেট প্লেসমেন্টের নামে পুঁজিবাজারে অনৈতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে ১৫৭২ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ৬ কোম্পানি। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শুরুর আগেই ওরিয়ন ফার্মাসিউটিক্যালস, জিএমজি এয়ালাইন্সসহ ৬টি কোম্পানি মূলধন সংগ্রহের নামে স্বল্পসংখ্যক শেয়ার প্লেসমেন্টে বিক্রির মাধ্যমে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। দেশের সিকিউরিটিজ আইনে প্লেসমেন্ট বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আইন না থাকার সুযোগে স্টক এক্সচেঞ্জের বাইরে অবৈধ লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। তবে উচ্চহার প্রিমিয়ামে প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে কোম্পানিগুলো শ’ শ’ কোটি টাকা সংগ্রহ করলেও নির্দিষ্ট সময়ে কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়ায় প্লেসমেন্টে বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা বিপাকে পড়েছেন। এদিকে প্লেসমেন্টে শ’শ’ কোটি টাকা আটকে যাওয়ায় পুঁজিবাজারে বিদ্যমান তারল্য সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। অপরদিকে মূলধন বৃদ্ধির অনুমোদন এবং প্লেসমেন্ট বরাদ্দ সংক্রান্ত আইন না করে সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) নিজেই অবৈধ প্লেসমেন্ট ব্যবসার সুযোগ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্লেসমেন্টের কারণে পুঁজিবাজারের বাইরে শেয়ার লেনদেনের নতুন যে পদ্ধতি চালু হয়েছে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। সম্প্রতি পুঁজিবাজারেও তালিকাভুক্ত হওয়ার আগেই অযৌক্তিক প্রিমিয়ামে প্লেসমেন্ট বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বেশ কয়েকটি কোম্পানি। অতি মূল্যায়িত পুঁজিবাজারে শেয়ার সংকটের সুযোগ নিয়ে একাধিক দুর্বল কোম্পানি মিথ্যা আর্থিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা অতিরিক্ত হাতিয়ে নিয়েছে। তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শুরুর আগেই সম্প্রতি বড় ধরনের প্লেসমেন্ট বিক্রি করা কোম্পানিগুলো হচ্ছে-ওরিয়ন ফার্মা লিমিটেড, ইউনিক হোটেল এন্ড রিসোর্ট লিমিটেড, লংকা বাংলা সিকিউরিটিজ, জিএমজি এয়ারলাইন্স, এসটিএস হোল্ডিংস (এপোলো হাসপাতাল)। এছাড়া কেয়া কটন মিলসও প্লেসমেন্টে শেয়ার বিক্রি করেছে।
জানা যায়, উল্লিখিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ প্লেসমেন্ট বরাদ্দ দিয়েছে ওরিয়ন ফার্মা লিমিটেড। কোম্পানিটি তার পরিশোধিত মূলধন থেকে ৭০ কোটি টাকার শেয়ার প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বিক্রি করেছে ৫২৫ কোটি টাকায়। প্লেসমেন্ট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ওরিয়ন ফার্মা লিমিটেড ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার বিক্রি করেছে ৭৫ টাকায়। এ কোম্পানির ইস্যু ম্যানেজার হচ্ছে আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড। ২০১০ সালের ৩১ আগস্ট এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৮০ কোটি টাকা থেকে ১৩০ কোটি টাকায় এবং আইপিওর জন্য ৬ ডিসেম্বর ১৩০ কোটি টাকা থেকে ১৫৫ কোটি টাকায় উন্নীত করার অনুমতি দেয় এসইসি। মাত্র ৪ মাসের ব্যবধানে এসইসি এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৭৫ কোটি টাকা বৃদ্ধির অনুমতি দিয়েছে, যা দিয়ে কোম্পানিটি অবৈধভাবে প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ৫২৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে।
প্লেসমেন্ট বিক্রির ক্ষেত্রে এরপরের অবস্থান হচ্ছে ইউনিক হোটেল এন্ড রিসোর্ট লিমিটেডের। কোম্পানিটি পরিশোধিত মূলধন থেকে মাত্র ৩০ কোটি টাকার শেয়ার প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বিক্রি করেছে ৪৮০ কোটি টাকায়। কোম্পানিটির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার প্লেসমেন্টে বিক্রি হয়েছে ১৬০ টাকায়। একই প্রক্রিয়ায় জিএমজি এয়ারলাইন্স পরিশোধিত মূলধন থেকে ৬০ কোটি টাকার শেয়ার প্লেসমেন্টে বিক্রি করেছে ৩০০ কোটি টাকায়। প্লেসমেন্ট বিক্রির ক্ষেত্রে জিএমজি এয়ারলাইন্স ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ার বিক্রি করেছে ৫০ টাকায়। ইতিমধ্যেই এ কোম্পানির প্রসপেক্টাসে দেয়া আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অপরদিকে লংকা বাংলা সিকিউরিটিজ পরিশোধিত মূলধন থেকে ৫ কোটি টাকার শেয়ার প্লেসমেন্টে বিক্রি করেছে ১২৫ কোটি টাকায়। এ কোম্পানির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার প্লেসমেন্টে বিক্রি হয়েছে ২৫০ টাকায়।
এদিকে প্লেসমেন্ট নিয়ে সবচেয়ে বেশি সন্দেহের সৃষ্টি করেছে এসটিএস হোল্ডিংস (এপোলো হাসপাতাল)। অন্যান্য কোম্পানি যেখানে প্লেসমেন্ট শেয়ার বরাদ্দে দশ থেকে পনের গুণ পর্যন্ত প্রিমিয়াম নিয়েছে সেখানে এ কোম্পানির প্লেসমেন্ট বিক্রি হয়েছে মাত্র দেড়গুণ দরে। এ কোম্পানিটি পরিশোধিত মূলধন থেকে ৮৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকার শেয়ার প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বিক্রি করেছে মাত্র ১৩০ কোটি টাকায়। এক্ষেত্রে কোম্পানিটি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার বিক্রি করেছে মাত্র ১৫ টাকায়। তবে রোড শো’র জন্য প্রস্তুত করা কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে প্রতিটি শেয়ারের নির্দেশক মূল্য প্রস্তাব করা হয়েছে ১২৫ টাকায়। এ কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয় হচ্ছে ১.৪৪ টাকা। ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এ কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয় ছিল ঋণাত্মক।
এছাড়া কেয়া কটন মিলস লিমিটেড তার পরিশোধিত মূলধন থেকে ৬ কোটি টাকার শেয়ার প্লেসমেন্টে বিক্রি করেছে ১২ কোটি টাকায়। প্লেসমেন্টের মাধ্যমে কেয়া কটন মিলের ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার বিক্রি করা হয়েছে ২০ টাকায়। যদিও কোম্পানিটি রোড শোতে প্রতিটি শেয়ারের নির্দেশক মূল্য প্রস্তাব করেছে ৬০ টাকায়। এছাড়া সামিট শিপিং লিমিটেড, কেওয়াইসিআর কয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ, গোল্ডেন হারভেস্ট এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ, ফারইস্ট নিটিং এন্ড ডায়িং ইন্ডাস্ট্রিজ, আনন্দ শিপইয়ার্ড, পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ, নাভানা রিয়েল এস্টেটসহ বেশ কিছু কোম্পানি প্লেসমেন্টের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা অতিরিক্ত হাতিয়ে নিয়েছে।
জানা গেছে, অনেক আগেই প্লেসমেন্ট নিয়ে নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত থাকলেও তা কার্যকর করেনি এসইসি। প্রাইভেট প্লেসমেন্ট নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে গত বছরের এপ্রিল মাসে এ বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এসইসি। সেই সময় সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক ইস্যু) বিধিমালা সংশোধনপূর্বক আইপিওর ক্ষেত্রে ১৫০ কোটি টাকার কম পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানির জন্য প্রাইভেট প্লেসমেন্ট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু সেটি কার্যকর করা হয়নি। এমনকি কোম্পানি থেকে প্লেসমেন্ট বরাদ্দধারীদের তালিকা জমা দেয়া বাধ্যতামূলক করেনি এসইসি। তবে পুঁজিবাজারে কয়েক হাজার কোটি টাকার জমজমাট প্লেসমেন্ট ব্যবসার পর গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর প্রাথমিকভাবে পাবলিক বা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির মূলধন সংগ্রহের জন্য বরাদ্দ করা শেয়ারের মালিকানা হস্তান্তরে এক বছরের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সিদ্ধান্ত নেয় এসইসি। এছাড়াও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আগে মূলধন সংগ্রহের জন্য উদ্যোক্তাদের বাইরে অন্য কারো কাছে শেয়ার বিক্রি করতে হলে কোম্পানির আর্থিক বিবরণীসহ প্রস্তাবনাপত্র (অফার ডকুমেন্ট) প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেয় এসইসি। তবে প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহে শৃঙ্খলা আনতে এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা জারি করেনি এসইসি। এ বিষয়ে এসইসির চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকারের সাথে টেলিফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

Source: sheershanews.com , 14 Feb, 2011